অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯৭১ সালে ধন্যি মেয়ে সিনেমায় মান্না দে-র কন্ঠে গাওয়া গানটি আজও অমর। অদ্ভুত একটা রোমান্টিসিজম রয়েছে গানের প্রতিটা লাইনে। বাংলা ও বাঙালির কাছে ‘চর্মগোলকে লাথি’ মারা শুধু একটি খেলা নয়, আবেগ। ভালোবাসাও। ‘আট থেকে আশি, ফুটবল নিয়ে বাঁচি’, এমন স্লোগান বাঙালি সমাজে মূলত দুইটি সময় শোনা যায়। এক, যখন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি হয়। ঘটি-বাঙালের চিরন্তন আকচাআকচি সামনে আসে। দুই, যখন ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসে দুনিয়ার কোনও এক প্রান্তে। আর সেই ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাত জেগে ব্রাজিল নাম আর্জেন্টিনার মাধ্যমে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় আপামর বাঙালি। শুধু ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা কেন, ফ্রান্স-জার্মানি-স্পেন-ইতালির মতো দেশের জন্যও গলা ফাটায় বাঙালি। রাত জেগে খেলা দেখে ফুটবল উন্মাদ হয়ে যায়। ভেসে যায় ফুটবল আবেগের স্রোতে।
নিখাদ আবেগ চান? পাবেন। ফাটাফাটি উন্মাদনা চান? পাবেন। ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে হাতাহাতি, রক্তারক্তি চান? বাঙালির সংসারে তাও পাবেন। আর সঙ্গে পাবেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা স্বাভাবিক ও প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন। আমরা কি কখনও ফুটবল বিশ্বকাপের আসরে যোগ দিতে পারব? পশ্চিম আফ্রিকার কেপ ভার্দের মতো সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল পর্বে পৌঁছে যেতে পারে। বিশ্বসেরার তাজ মাথায় থাকা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে কাঁধিয়ে দিতে পারে। জিতে নিতে পারে ফুটবল দুনিয়ার হৃদয়। অথচ, ১৪০ কোটির ভারতবর্ষ পারে না। সত্য সেলুকাস, বড় বিচিত্র এই দেশ।
ভারত এখন ক্রিকেটের দেশ! ইতিমধ্যেই ক্রিকেট ভারতবাসীর কাছে ধর্মে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এমন কথা প্রায়ই বলে থাকেন। হয়তো ক্রিকেট আসমুদ্রহিমাচলের মনের গভীরে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু সেই মনের গভীরে ফুটবল কি সম্পূর্ণ ব্রাত্য? মনে হয় না। অন্তত চার বছর অন্তর ফুটবল বিশ্বকাপের সময় প্রতিবার যে আবেগের স্ফুরণ ঘটে গোটা দেশে, তারপর ভারতে ফুটবল নিয়ে আগ্রহ নেই, এমন কথা বিশ্বাস করা কঠিন। অথচ, বাস্তব ছবি ভিন্ন কথা বলছে। যার নির্যাস, সবাই পারে, ভারত পারে না।
ফুটবলের আঙিনায় সব দেশই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়। প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশে স্কিল ও দক্ষতাকে আরও উন্নত করে। আর আমাদের দেশ ভারত শুধুই পিছিয়ে পড়ার সরণিতে থেকে যায়। কিন্তু কেন? পিছনে রয়েছে নানা কারণ। সবচেয়ে বড় কারণ হল, ১৪০ কোটি দেশের সব রাজ্যে ফুটবল খেলা হয়, এমন নয়। আমাদের দেশে এমন অনেক রাজ্য রয়েছে, যেখানে ফুটবলের চলই নেই। বাংলা, গোয়া, কেরল ও কিছুটা পাঞ্জাবকে বাদ দিলে দেশের বাকি রাজ্যগুলি ফুটবলকে কখনই গুরুত্ব দেয়নি। শেষ কয়েক বছরে দেশের উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে ফুটবল কেন্দ্রিক আগেব প্রবলভাবে ডালপালা মেলেছে। কিন্তু সেটা বিদেশি ফুটবলের আবেগ। স্প্যানিশ লিগ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের লাফালাফি আর যাই হোক না কেন, ভারতীয় ফুটবলকে এগিয়ে দিতে পারেনি। ভারতীয় ফুটবলের মূল স্রোতে তার কোনও প্রভাবও পড়েনি। আমাদের দেশে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগাকে নিয়ে যেমন আবেগ রয়েছে। তেমনই বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি, প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের মতো ক্লাবগুলিকে নিয়েও উন্মাদনা রয়েছে প্রবল। এমন আবেগের প্রভাব ভারতীয় ফুটবলে পড়েনি কখনওই।
লেটস ফুটবল। অনেক স্বপ্ন, আবেগ নিয়ে ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল আইএসএল। বিদেশের বহু কিংবদন্তি ফুটবলার ইতিমধ্যেই খেলে গিয়েছেন আইএসএলে। আখেরে ভারতীয় ফুটবলের কোনও লাভ হয়নি। বর্তমানে সেই আইএসএলের ভবিষ্যত নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। অশনি সংকেত। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন আর থাকতে রাজি নয় ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে। কেন? সহজ জবাব, ফুটবল নিয়ে উন্মাদন থাকলেও আয় হচ্ছে কই? ভারতীয় ফুটবলও আগামীর দিশা পাচ্ছে না। নেপথ্যের কারণ, গোড়ায় গলদ। মাস খানেক আগে জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার মেহতাব হোসেন কলকাতা ক্রীড়া সাংবাদিক ক্লাবে অনূর্ধ্ব-১৩ মহিলা ফুটবল স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে জানিয়েছিলেন, ফুটবল খেলাটা সময়ের সঙ্গে বদলে চলেছে নিয়মিত। ৮-১০ বছরে একজন খুদে যখন ফুটবল শুরুর কথা ভাবছে, তখন তার শরীরের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস প্রয়োজন।
চূড়ান্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, ১৪০ কোটি দেশের বেশিরভাগ মানুষই একথা জানেন না। অথবা, জানলেও বেশিরভাগেরই কিছু করার থাকে না। কারণ, আমাদের দেশের ফুটবল প্রতিভার একটা বড় অংশ উঠে আসে জেলা স্তর থেকে। সেখানে না আছে সঠিক পরিকাঠামো, না রয়েছে প্রতিভাকে আগামীর দিশা দেখানোর দিশারী। চূড়ান্ত প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও যদি কেউ তৃণমূল স্তর থেকে ফুটবলের মূল স্রোতে উঠে আসতে পারেন, তাহলে তাঁকে ক্লাব ফুটবলের অন্ধকার দিক, যার পোশাকি নাম কাটমানি। সঙ্গে উন্নততর প্রশিক্ষণের দূরাবস্থা তো রয়েছেই। তাই ফিফা র্যাংকিয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা দেশও নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভারতকে অনায়াসে টপকে যায়। পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের মূল পর্বে। আমরা, ১৪০ কোটির দেশ শুধু 'চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন'।