আটাশ বছরের সঙ্গী প্রতীকটা আপাতত হাতছাড়া। নির্বাচন কমিশন ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুল ও ঘাস’ (জোড়াফুল) প্রতীক — দুটোই ফ্রিজ করে দিয়েছে। ফল: আসন্ন উপনির্বাচনে তৃণমূলের দুই যুযুধান শিবিরের কাউকেই পুরনো নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে না।
শুক্রবার কমিশন দু’পক্ষকে আলাদা নাম ও প্রতীক বরাদ্দ করেছে। মুখ্য বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির লড়বে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামে, প্রতীক ফুটবল খেলোয়াড়। অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির পেয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও খাম প্রতীক।
একটা জরুরি পার্থক্য
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। কমিশন কোনও পক্ষকে জোড়াফুল দেয়নি। প্রতীকটি ফ্রিজ করা হয়েছে — অর্থাৎ আপাতত কেউই তা ব্যবহার করতে পারবেন না, এবং আসল দল কে, সেই বিবাদ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকবে। ‘প্রতীক অন্য পক্ষ পেয়ে গেল’ — এমনটা এখনও ঘটেনি।
কমিশনের নির্দেশ
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধুর স্বাক্ষরে ১৪ পাতার একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ জারি হয়। তাতে বলা হয়, নির্বাচনী প্রতীক (সংরক্ষণ ও বণ্টন) আদেশ, ১৯৬৮-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন পক্ষ দলের নাম ও প্রতীকের অধিকারী, তা কমিশনকেই স্থির করতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দু’পক্ষকেই বিকল্প পরিচয়ে ভোটে লড়তে হবে।
শুক্রবার সকাল ১১টার মধ্যে দু’পক্ষকে তিনটি করে সম্ভাব্য নাম ও তিনটি করে মুক্ত প্রতীকের অগ্রাধিকার তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছিল। মমতা শিবির বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ ই-মেলে তালিকা পাঠায়; অরূপ-ঋতব্রত শিবির জমা দেয় শুক্রবার সকালে। কমিশনের হাতে মুক্ত প্রতীকের তালিকায় রয়েছে ১৮৪টি চিহ্ন।
বিবাদের সূত্রপাত কোথায়
গত ২২ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনকে জানান, দলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিই শেষ হয়ে গিয়েছে। ওই দিনই একটি বিশেষ অধিবেশনে অরূপ রায়কে নতুন চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করা হয় বলে তাঁদের দাবি।
মমতা শিবিরের পাল্টা যুক্তি — পাঁচ বছরের নিয়মে পরের সাংগঠনিক নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৭ সালে, তাই ২২ জুনের ওই অধিবেশন গঠনতন্ত্রবিরোধী ও অবৈধ।
শিবিরনেতৃত্বেনতুন নাম ও প্রতীকমমতা শিবিরমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, সাগরিকা ঘোষমমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস — ফুটবল খেলোয়াড়অরূপ শিবিরঅরূপ রায়; ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস — খাম
ভোট কোথায়, কবে
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন ৬ অক্টোবর। অসমের নগাঁওতেও ভোট রয়েছে। তিনটি আসনেই দুই শিবিরের আলাদা প্রার্থী থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল — রেজিনগরে রবিউল আলম চৌধুরী (মমতা) ও সইফুজ্জামান শেখ (অরূপ), নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান (দে) (মমতা) ও এহতেশামুল হক (অরূপ), নগাঁওয়ে আব্দুল সালাম (মমতা)। মনোনয়নপত্রগুলি এখন জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-র ৩৬ নম্বর ধারায় আলাদা ভাবে খতিয়ে দেখবেন রিটার্নিং অফিসাররা।
এক নজরে
- কমিশনের নির্দেশ: ১৭ সেপ্টেম্বর রাত, ১৪ পাতার অন্তর্বর্তী আদেশ
- ফ্রিজ: ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ফুল ও ঘাস’ প্রতীক
- মমতা শিবির: মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, প্রতীক ফুটবল খেলোয়াড়
- অরূপ শিবির: ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস, প্রতীক খাম
- আইনি ভিত্তি: প্রতীক আদেশ ১৯৬৮-র ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ
- ভোট: নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর, ৬ অক্টোবর
দু’পক্ষের প্রতিক্রিয়া
মমতা শিবির সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। রাতভর আলোচনার পর আইনজীবী ও সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন —
‘‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ আমরা মানতে পারছি না। আদেশে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা বাস্তবসম্মত নয়।’’
— কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
উল্টো দিকে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ঋতব্রত শিবির। তাঁর দাবি, কমিশনের নির্দেশেই স্পষ্ট হয়েছে যে দল একটি ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’-র মতো চলছিল, অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হত।
বিরোধী শিবিরেও প্রতিক্রিয়া মিশ্র। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর কটাক্ষ, রাজ্যে বিজেপিকে এনে এখন দল নিজেই ভাঙছে। অন্য দিকে কংগ্রেস সাংসদ কে সি বেণুগোপাল ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব কমিশনের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
মমতার সামনে কী পথ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে তিনটি রাস্তা খোলা — কমিশনের সামনে সাংগঠনিক ও পরিষদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিস্তারিত প্রমাণ পেশ করা; কমিশনের আদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা; অথবা আপাতত নতুন প্রতীকে ভোটে লড়ে মূল মামলা চালিয়ে যাওয়া। মমতা আদালতে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর।
উল্লেখ্য, ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে কমিশনের হাতে এমন ক্ষমতাও রয়েছে যে চূড়ান্ত রায়ে কোনও পক্ষকেই আসল দল হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে প্রতীকটি স্থায়ী ভাবে ফ্রিজ রেখে দেওয়া যেতে পারে।
দ্রষ্টব্য: এটি কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ, চূড়ান্ত রায় নয়। নাম ও প্রতীক সংক্রান্ত মূল বিবাদ কমিশনে বিচারাধীন। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত সংবাদ ও কমিশনের নির্দেশ সংক্রান্ত বিবরণের ভিত্তিতে তৈরি।
ট্যাগ: #তৃণমূলকংগ্রেস #জোড়াফুল #নির্বাচনকমিশন #মমতাবন্দ্যোপাধ্যায় #ঋতব্রতবন্দ্যোপাধ্যায় #অরূপরায় #নন্দীগ্রাম #রেজিনগর #উপনির্বাচন২০২৬ #প্রথমসন্দেশ