ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশী। আজ, মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর জঙ্গলমহল জুড়ে করম পরব — বাংলায় যাকে করম পুজোও বলা হয়। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামে গ্রামে আজ রাতভর ঝুমুরের সুর আর করম নাচ।
রাজ্যজুড়ে পূর্ণদিবস ছুটি
উৎসব উপলক্ষে রাজ্যে আজ পূর্ণদিবস ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। অর্থ দফতরের ৩৪৭৯-এফ(পি২) নম্বর বিজ্ঞপ্তিতে — যা গত ২৭ নভেম্বর ২০২৫-এর ৪১৮৮-এফ(পি২) স্মারকের সংশোধনী — জানানো হয়েছে, আজ বন্ধ থাকছে রাজ্য সরকারি কার্যালয়, পঞ্চায়েত ও পুরসভা-সহ স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থা, বিধিবদ্ধ সংস্থা, বোর্ড, কর্পোরেশন এবং সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তরবঙ্গের চা বাগানের আদিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ছুটি প্রযোজ্য।
ছুটির জেরে বদলাতে হয়েছে পরীক্ষাসূচিও। উচ্চমাধ্যমিক তৃতীয় সেমেস্টারের যে ভোকেশনাল বিষয়ের পরীক্ষাগুলি আজ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলি পিছিয়ে ১৩ অক্টোবর করা হয়েছে।
এক নজরে
কবে: ভাদ্র শুক্লা একাদশী — এ বছর ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার
ছুটি: পূর্ণদিবস; অর্থ দফতরের ৩৪৭৯-এফ(পি২) বিজ্ঞপ্তি
বন্ধ: সরকারি অফিস, পঞ্চায়েত-পুরসভা, বোর্ড-কর্পোরেশন, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়
পরীক্ষা: উচ্চমাধ্যমিক তৃতীয় সেমেস্টারের ভোকেশনাল পরীক্ষা পিছিয়ে ১৩ অক্টোবর
কোথায়: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর — মানভূম অঞ্চল
মূল আচার: জাওয়া, করম ডাল স্থাপন, উপবাস, রাতভর ঝুমুর ও করম নাচ
উৎসবটা আসলে কী
করম পরব মূলত ফসল ও প্রকৃতির উৎসব, আর তার কেন্দ্রে একটি গাছ — করম গাছ। ভূমিজ, কুড়মি, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, হো, খেড়িয়া, শবর, কোড়া, লোহার-সহ বহু জনগোষ্ঠী এই পরব পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ ও অসমে, এমনকি বাংলাদেশ ও নেপালেও এর চল রয়েছে।
উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় দিন কয়েক আগে থেকে। অবিবাহিত মেয়েরা ঝুড়িতে বীজ বুনে তৈরি করেন ‘জাওয়া’ — অঙ্কুরিত সেই চারাই উর্বরতা ও নতুন প্রাণের প্রতীক। পরবের দিন আখড়ায় বা উঠোনে পোঁতা হয় করম গাছের ডাল, যাকে বলা হয় করম ঠাকুর। তরুণীরা সারাদিন উপবাস করেন, সন্ধেয় নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো হয়, কাহিনি পাঠ করেন গ্রামের প্রবীণ কেউ।
তারপর শুরু হয় নাচ। ঢোল, মাদল আর ধামসার তালে ভাদরিয়া ঝুমুর — সূর্য ওঠা পর্যন্ত চলে সম্মিলিত করম নাচ। এই নাচে অংশ নেন মূলত অবিবাহিত ও নববিবাহিত নারীরা। করম-সখীরা একে অপরের হাতে বেঁধে দেন ‘করমডোর’, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি হিসেবে। শেষে জাওয়া ও করম ডাল বিসর্জন দেওয়া হয় নদী বা পুকুরে।
পরবের সঙ্গে জড়িয়ে রাজনীতিও
জঙ্গলমহলে করম পরব শুধু ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারেরও অংশ। গত ২০ সেপ্টেম্বর, রবিবার পুরুলিয়ার কড়াডি মাঠে কুড়মি সমাজের ‘করম পরবতিয়া মহাজড়ুআহি’-তে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। আয়োজকদের দাবি ছিল, প্রায় ৪০ হাজার করম নৃত্যদল অংশ নেবে; বাংলা, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা ছিল। সফরসূচিতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক ও রবীন্দ্র ভবনে সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের নিয়ে অনুষ্ঠানও ছিল।
পটভূমিতে রয়েছে কুড়মি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের তফসিলি উপজাতি (এসটি) স্বীকৃতির দাবি। এই দাবি নিয়ে আদিবাসী সংগঠনগুলির মধ্যেই মতপার্থক্য রয়েছে, যা জঙ্গলমহলের সামাজিক সমীকরণকে জটিল করে রেখেছে। ফলে করম পরবের মঞ্চ প্রতি বছরই রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া-নেওয়ার জায়গা হয়ে ওঠে।
দ্রষ্টব্য: আচার-অনুষ্ঠানের বিবরণ অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা হতে পারে। ছুটি সংক্রান্ত তথ্য রাজ্য অর্থ দফতরের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।
ট্যাগ: #করমপরব #করমপুজো২০২৬ #জাওয়া #ঝুমুর #পুরুলিয়া #ঝাড়গ্রাম #বাঁকুড়া #জঙ্গলমহল #কুড়মি #রাজ্যছুটি #প্রথমসন্দেশ