বছরে একটাই রাত, আর সেই রাতে ভাগীরথীর জল যেন আলোয় ভেসে যায়। ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার — আজ, ১৭ সেপ্টেম্বর — মুর্শিদাবাদের লালবাগে হাজারদুয়ারি ও নিজামত ইমামবাড়া সংলগ্ন নদীঘাটে পালিত হবে বেড়া উৎসব, যা স্থানীয় ভাবে বেড়া ভাসান নামেই বেশি পরিচিত। সন্ধে নামতেই শুরু, চলবে সারা রাত।
ভেলা তৈরি হয় বাঁশ আর কলাগাছে
উৎসবের কেন্দ্রে থাকে একটি সাজানো ভেলা। বাঁশ আর কলাগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি সেই ভেলা সাজানো হয় রঙিন কাগজ, মোমবাতি ও প্রদীপে। ভেলার মাঝখানে থাকে ময়ূরপঙ্খী গড়নের চারটি কাঠামো। নবাবি আমলে ভেলার উপর বাঁশ দিয়ে মিনার, খিলান, গম্বুজ, কেল্লার আদল গড়া হত; অভ্রের পাতায় আঁকা থাকত নানা ছবি, ঝুলত রুপো-মোড়া কৃত্রিম আলো।
জলের অধিদেবতা হিসেবে পূজিত খোয়াজ খিজির-এর উদ্দেশে সুজি-হালুয়া-শিরনি নিবেদন করে ভেলা ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। সঙ্গে আতশবাজি। মুর্শিদাবাদের জাফরগঞ্জ এই ধরনের ভেলা তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এক নজরে
- কবে: ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার — এ বছর ১৭ সেপ্টেম্বর, রাতভর
- কোথায়: লালবাগ, ভাগীরথীর ঘাট, হাজারদুয়ারি ও নিজামত ইমামবাড়া সংলগ্ন
- কী হয়: বাঁশ-কলাগাছের আলোকসজ্জিত ভেলা ভাসানো, শিরনি নিবেদন, আতশবাজি
- কাকে উদ্দেশ করে: জলের অধিদেবতা খোয়াজ খিজির
- ভেলা তৈরির কেন্দ্র: জাফরগঞ্জ
- বয়স: তিনশো বছরের বেশি
ইতিহাস: ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ
গবেষকদের একাংশের মতে, এই রীতির সূচনা ঢাকায়, সপ্তদশ শতকের শেষভাগে, সুবেদার মুকাররম খানের আমলে। ১৭০৪ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খান ঢাকা থেকে দেওয়ানি দফতর মুকসুদাবাদে সরিয়ে আনেন — পরে যার নাম হয় মুর্শিদাবাদ। উৎসবও তখন ভাগীরথীর তীরে চলে আসে বলে মনে করা হয়।
তবে প্রবর্তক কে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কৃতিত্ব দেন মুর্শিদ কুলি খানকে, আবার গোলাম হোসেন-সহ কারও কারও মতে এই উৎসবের প্রসার ঘটে নবাব সিরাজদ্দৌলার আমলে। ১৯২০ সালে প্রকাশিত জে এইচ ওয়ালশের ‘আ হিস্ট্রি অফ মুর্শিদাবাদ’-এও উৎসবটিকে নবাবি আমলের বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নবাবরা দিল্লির বাদশাহের উদ্দেশে নজরানা বোঝাই সাজানো নৌকা পাঠাতেন। সেই যাত্রা নির্বিঘ্ন হোক — এই প্রার্থনা থেকেই জলদেবতার উদ্দেশে ভেলা ভাসানোর রীতি। হাতি, ঘোড়া, কামান দাগা আর বাজনা নিয়ে শোভাযাত্রা বেরোত। বলা হয়, সেই রাতে লালবাগ থেকে মহিনগর পর্যন্ত গঙ্গা আলোয় ঝলমল করত।
একটি তথ্য এখানে স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। আজ উৎসব হয় যে ঘাটে, তা হাজারদুয়ারি সংলগ্ন — কিন্তু হাজারদুয়ারি প্রাসাদ তৈরি হয়েছে অনেক পরে, ১৮২৯ থেকে ১৮৩৭ সালের মধ্যে, নবাব নাজিম হুমায়ুন জা-র আমলে, স্থপতি কর্নেল ডানকান ম্যাকলাউডের নকশায়। অর্থাৎ মুর্শিদ কুলি খানের সময়ে ওই প্রাসাদ ছিল না; ঘাটটি হাজারদুয়ারির নামে পরিচিত হয়েছে অনেক পরে।
ধর্মের সীমানা পেরিয়ে
শুরুতে এটি ছিল মূলত মুসলিম রীতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাংলার হিন্দু ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও নিজেদের আচার-অনুষ্ঠান মিশিয়ে এই উৎসবে যোগ দেন। আজও ভাগীরথীর দু’পাড়ে ভিড় জমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষই — এটাই মুর্শিদাবাদের বেড়া উৎসবের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
নবাবি জৌলুস আর নেই, খরচের ধাক্কায় কোনও কোনও বছর উৎসবের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। তবু ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার এলে লালবাগের ঘাটে ভিড় জমে, ভেলা ভাসে, আকাশে আতশবাজি ফাটে। তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে এই দৃশ্য দেখে আসছে ভাগীরথী।
দ্রষ্টব্য: বেড়া উৎসবের সূচনাকাল ও প্রবর্তক নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই প্রতিবেদনে প্রচলিত ও নথিভুক্ত বিবরণগুলি পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয়েছে।
ট্যাগ: #বেড়াউৎসব #বেড়াভাসান #মুর্শিদাবাদ #ভাগীরথী #হাজারদুয়ারি #খোয়াজখিজির #নবাবিআমল #লালবাগ #প্রথমসন্দেশ