নিজস্ব সংবাদদাতা
সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে, বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা যখন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে, তখনই জন্ম নেয় এমন কিছু উদ্যোগ, যা একসময় বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। কলকাতার সরকার-নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন "পর্ণশ্রী পল্লী নবজাগরণ সমিতি" সেই রকমই এক মানবিক উদ্যোগ, যা প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজসেবার ক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে।
২০২২ সালে পথচলা শুরু হয় এই সংগঠনের। সংগঠনের মূলমন্ত্র 'সার্ভিং কমিউনিটি উইথ হিউম্যানিটি', অর্থাৎ 'মানবতার সেবায় সমাজের পাশে'। নামের মধ্যেই যেমন নবজাগরণের আহ্বান, তেমনি কর্মকাণ্ডেও রয়েছে মানবিক মূল্যবোধকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে।
সংগঠনের নিজস্ব ওয়েবসাইট (www.ppns.in)-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ৩৫-এরও বেশি এবং ইতিমধ্যেই প্রায় এক হাজারেরও বেশি মানুষের জীবনে তাদের বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সংখ্যার বিচারে হয়তো এটি খুব বড় নয়, কিন্তু সীমিত সামর্থ্য নিয়েও মানুষের কাছে পৌঁছনোর যে আন্তরিক প্রচেষ্টা সংগঠনটি চালিয়ে যাচ্ছে, সেটিই তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি উপলব্ধি করেছে, সমাজসেবা শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি, সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্যভাবে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত সমাজসেবার পরিচয়। সেই লক্ষ্যেই বছরের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা সহায়তা, বস্ত্র বিতরণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বৃক্ষরোপণ, রক্তদান এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে তারা। দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংগঠনটি ইতিমধ্যেই সমাজের বহু মানুষের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সেই বিশ্বাসযোগ্যতারই প্রতিফলন।
স্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রে "পর্ণশ্রী পল্লী নবজাগরণ সমিতি"-র অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও সচেতনতা কর্মসূচি। বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া এমন একটি বংশগত রোগ, যার ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং সময়মতো রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ থেকে থ্যালাসেমিয়া দূর করতে বিয়ের আগে কুষ্ঠী বিচার করার থেকেও রক্ত পরীক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বার্তা সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে সংগঠনটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, আবাসিক হোম, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সহ বিভিন্ন জায়গায় থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা শিবির ও স্ক্রিনিং পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছে।
সম্প্রতি ঠাকুরপুকুরের সেভ দ্য চিলড্রেন হোমে, সরকারি হাসপাতালের সহযোগিতায় আয়োজিত এরকমই একটি থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে প্রায় ১১৪ জন আবাসিকের রক্ত পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। একইসঙ্গে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগের বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং প্রতিরোধের গুরুত্ব নিয়ে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রসারে এই ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
সংগঠনের কর্মকাণ্ডের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর বিস্তৃত কর্মপরিধি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং, করঞ্জলি, ঘটিহারানিয়া-সহ জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায়, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পুরুলিয়া এবং দুর্গাপুরের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে, শহর ও শহরতলির বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, বস্ত্র বিতরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক সহায়তার মতো বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনের সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের পরিধি শুধুমাত্র এই রাজ্যের সীমারেখার মধ্যেই আবদ্ধ না থেকে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলগুলিতেও প্রসারিত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সংগঠনের এক সদস্যের ঐকান্তিক উদ্যোগে সুদূর বেঙ্গালুরুতেও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। একটি স্থানীয় সংগঠনের কর্মকাণ্ড যখন ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন তা তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং মানবিক অঙ্গীকারেরই পরিচয় বহন করে।
শুধু স্বাস্থ্য বা পরিবেশ নয়, শিক্ষার প্রসারেও সংগঠনটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের হাতে শিক্ষা সামগ্রী তুলে দেওয়া, শিক্ষার প্রতি উৎসাহ জোগানো এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তারা শিক্ষা ও মানবিকতার মধ্যে এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি দুর্গাপূজা বা বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে নতুন বজ্র কিংবা শীতকালে শীতবস্ত্র-সহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণের মতো কর্মসূচিতেও সংগঠনেরটির সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আজকের দিনে অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাই সরকারি অনুদান কিংবা কোনো কর্পোরেট সংস্থার সি.এস.আর.-এর আর্থিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু পর্ণশ্রী পল্লী নবজাগরণ সমিতির পথচলা কিছুটা ব্যতিক্রমী। কোনও সরকারি আর্থিক সহায়তা বা সি.এস.আর-এর থেকে প্রাপ্ত কোনো অনুদান ছাড়াই সংগঠনটি প্রথম দিন থেকেই তাদের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের শুভানুধ্যায়ী, স্বেচ্ছাসেবক, সদস্য এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুদানের উপর নির্ভর করেই এই কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মানুষের বিশ্বাসই সংগঠনটির সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করাকেই তারা প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করে।
প্রযুক্তির ব্যবহারেও সংগঠনটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে গেছে। নিজস্ব ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল-সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সমাজসেবামূলক উদ্যোগের তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়। এর ফলে শুধু এই রাজ্যেই নয়, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারছেন এবং অনেকেই এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছেন। সংগঠনের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি কর্মসূচির তথ্য ও আলোকচিত্র নিয়মিতভাবে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সংগঠনটির বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
মাত্র চার বছরের পথ চলায় "পর্ণশ্রী পল্লী নবজাগরণ সমিতি" হয়তো বিশাল কোনও প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি, কিন্তু সমাজসেবার ক্ষেত্রে তাদের ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যেই বহু মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও যে সুসংগঠিত পরিকল্পনা, নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসাকে সম্বল করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বীজ বপন করা যায়, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই সংগঠন। আজ যখন সমাজের নানা প্রান্তে বিভাজন, স্বার্থপরতা ও উদাসীনতার ছবি সামনে আসে, তখন "পর্ণশ্রী পল্লী নবজাগরণ সমিতি"-র মতো সংগঠনগুলি মনে করিয়ে দেয়- মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আন্তরিক ইচ্ছাই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি। মানবতার স্পর্শে সমাজসেবার এই নবজাগরণ আগামী দিনে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ুক-এটাই প্রত্যাশা।