১৪ আগস্ট, ২০২৬
প্রথম সন্দেশ দেশ ও প্রবাসের রাজনৈতিক খবর বিশ্লেষণের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম
ব্রেকিং
প্রথম সন্দেশ
খেলাধুলা

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: আবেগের খেলায় প্রযুক্তির ছায়া

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: আবেগের খেলায় প্রযুক্তির ছায়া

দেবাশীষ ব্যানার্জী


ফুটবলে একটি গোল মানে শুধু স্কোরবোর্ডে একটি সংখ্যা যোগ হওয়া নয়। একটি গোল বদলে দিতে পারে একটি ম্যাচ, একটি টুর্নামেন্ট, এমনকি একটি প্রজন্মের স্মৃতিও। বহু দশক ধরে দর্শকের কাছে গোলের মুহূর্ত এক নিখাদ আবেগের বিস্ফোরণ-বল জালে জড়ালেই গ্যালারি গর্জে ওঠে, খেলোয়াড়রা ছুটে যায় কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে, আর ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে ধরা পড়ে এক ইতিহাসের জন্ম। কিন্তু এখন অনেক সময়েই গোল হওয়ার পরেও বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস রূপ নেয় এক রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়; কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন অনেক ক্ষেত্রেই আসে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ('ভার') এবং সেমি-অটোমেটেড প্রযুক্তির বিশ্লেষণ থেকে। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের একাধিক ম্যাচে প্রযুক্তির পর্যালোচনায় কোথাও ধরা পড়েছে অফসাইডের অতি সূক্ষ্ম ব্যবধান, কোথাও আক্রমণের শুরুতে ফাউল, আবার কোথাও গোলরক্ষককে বাধা দেওয়ার অভিযোগ; ফলে বল জালে জড়ালেও গোলের স্বীকৃতি আসেনি।

তবে প্রযুক্তির এই কঠোর চোখ কেবল গোল বাতিলের 'খলনায়ক' হিসেবেই কাজ করেনি, অনেক সময় মাঠে চরম অবিচারের হাত থেকে দলগুলোকে বাঁচিয়ে খেলায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ম্যাচের তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে এমন অনেক সূক্ষ্ম ফাউল, হ্যান্ডবল বা ট্যাকল থাকে, যা খালি চোখে রেফারির এড়িয়ে যাওয়া বা ভুল বোঝা খুব স্বাভাবিক হলেও প্রযুক্তির ক্যামেরায় ধরা পড়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দেখা গেছে, রেফারি প্রথমে ফাউল বা পেনাল্টি না দিলেও, পরবর্তীতে 'ভার'-এর হস্তক্ষেপে এবং অন-ফিল্ড রিভিউয়ের মাধ্যমে সঠিক ফাউল বা পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে যে দলটি মাঠে অবিচারের শিকার হতে পারত, প্রযুক্তির কল্যাণে তারা সঠিক বিচার পেল। এই দিকটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি শুধু আনন্দ কেড়ে নেওয়ার যন্ত্র নয়, বরং ফুটবলের মাঠে ন্যায্যতার এক বিশ্বস্ত প্রহরীও বটে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে বহু ঘটনা আজও আলোচনার বিষয়। ১৯৬৬ সালের বিতর্কিত গোললাইন সিদ্ধান্ত, ১৯৮৬ সালের 'হ্যান্ড অব গড', ২০১০ সালে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড-এর গোললাইন অতিক্রম করেও গোল স্বীকৃতি না পাওয়া-এসব ঘটনাই এক সময় ফুটবল বিশ্বকে প্রযুক্তির দাবি তুলতে বাধ্য করেছিল। আর সেই দাবির ধারাবাহিকতাতেই বিশ্ব ফুটবল নিয়ম ও প্রযুক্তির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পৌঁছেছে আজকের 'ভার'-যুগে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে যতটা সম্ভব তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল করার চেষ্টা চলছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অফসাইড নির্ধারণে। সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ও বলের ভেتরের সেন্সরের সাহায্যে এখন মিলিসেকেন্ডের নির্ভুলতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এমনকি খালি চোখে অদৃশ্য ব্যবধানও 'ভার' শনাক্ত করতে পারছে। ফলে খেলোয়াড়ের শরীরের সামান্য অংশও অফসাইডে রয়েছে কি না, সেটা এখন নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফুটবল আইনে ব্যবধান নয়, অবস্থানই নির্ধারক। তবে প্রশ্ন উঠছে-এত সূক্ষ্ম পার্থক্য কি সত্যিই খেলায় প্রভাব ফেলে, নাকি এটি শুধু প্রযুক্তিগত নিখুঁততার প্রদর্শন?

শুধু অফসাইড নয়, অনেক ক্ষেত্রেই গোল হওয়ার পর আক্রমণের শুরুতে রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম ফাউলও 'ভার'-এর মাধ্যমে শনাক্ত হচ্ছে। ফলে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে করা গোলও বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত সমর্থকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে-একদিকে ন্যায্যতার দাবি, অন্যদিকে ফুটবলের স্বাভাবিক শারীরিক লড়াইয়ের ঐতিহ্য।

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং খেলার আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আই.এফ.এ.বি. বহু বছর ধরে ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহারকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে এসেছে। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই এবারের বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হয়েছে আরও উন্নত 'ভার' ও সেমি-অটোমেটেড প্রযুক্তি। ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়ারলুইগি কলিনার মতে, নতুন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য রেফারির কর্তৃত্ব কমানো নয়; বরং তাঁকে আরও নির্ভুল তথ্য দিয়ে সহায়তা করা। তাঁর দাবি, অধিকাংশ সিদ্ধান্ত আগের তুলনায় দ্রুত হয়েছে এবং খেলার কার্যকর সময়ও বেড়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে বাতিল হয়ে যাওয়া বা রিভিউয়ের মাধ্যমে নাটকীয়ভাবে বদলে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলো শুধু পরিসংখ্যানের অংশ নয়, এগুলি আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত দর্শনের প্রতীক। যেখানে একটি অসাধারণ ফিনিশ, দুরন্ত হেড, শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোল কিংবা পেনাল্টির আবেদন-সবই শেষ পর্যন্ত আইন, প্রযুক্তি এবং রেফারির যৌথ বিচারের মুখোমুখি হয়। ঠিক এই কারণেই, স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভিনিসিয়স জুনিয়রের সেই চোখধাঁধানো গোল ম্লান হয়ে যায় আক্রমণের শুরুর এক ফাউলের রিভিউতে; পর্তুগালের বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোলের উল্লাস কেড়ে নেয় অফসাইডের অতি সূক্ষ্ম রেখা; এমনকি নক-আউট পর্বে জার্মানির অতিরিক্ত সময়ের গোলটিও শেষ পর্যন্ত নাকচ হয়ে যায় গোলরক্ষককে বাধা দেওয়ার অভিযোগে। এই ঘটনাগুলি শুধু ম্যাচের ফলাফলই বদলায়নি, প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবলের নতুন চরিত্রকেও সংজ্ঞায়িত করেছে।

সব মিলিয়ে ফুটবল যেন এখন এক নতুন বিচারব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রযুক্তি ক্রমশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক হয়ে উঠছে। ফলে আজকের ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে দুই বাস্তবতার মাঝখানে-একদিকে মানুষের আবেগ, অন্যদিকে প্রযুক্তির নির্ভুলতা। হয়তো আগামী দিনে প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে। সিদ্ধান্ত আসবে আরও দ্রুত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও বড় ভূমিকা নেবে। তবু একটি বিষয় কখনও বদলাবে না-বল জালে জড়ানোর সেই প্রথম বিস্ফোরণ, গ্যালারির গর্জন, খেলোয়াড়ের উল্লাস আর কোটি কোটি দর্শকের একসঙ্গে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মুহূর্ত অথবা ন্যায্য পেনাল্টি বা ফ্রি-কিক না পাওয়ার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তবে সেই উল্লাস বা ক্ষোভেরও এখন এক নতুন বাস্তবতা আছে। মাঠে উচ্ছ্বসিত আনন্দ কিংবা তীব্র ক্ষোভের তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশের পরও শেষ কথা আর সেখানেই শেষ হয় না; কোন মুহূর্তে এক লহমায় সব সমীকরণ বদলে যাবে, তার চূড়ান্ত চিত্রনাট্য আজ প্রযুক্তির আঙিনাতেই লেখা হয়। আজ রেফারির বাঁশি আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতীক নয়; প্রযুক্তির সবুজ সংকেতের অপেক্ষাও সেই মুহূর্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক ফুটবলের এই নতুন সমীকরণে আবেগ আর প্রযুক্তি এখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী। হয়তো আগামী দিনের ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে আবেগ আর প্রযুক্তির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য-আর সেই ভারসাম্য অটুট রাখাই হবে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন: Facebook WhatsApp