শমীক গোস্বামী
পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া রাজ প্রথমবার। বামপন্থী এবং কংগ্রেসী মনোভাবের মানুষদের তেঁতো লাগার কথা। বাম আবার শূন্যের খরা কাটিয়ে বিধানসভায় খাতা খুলেছে, তবু সংখ্যার নিরিখে পাত্তা পাওয়ার মতো নয়। কাজেই তাদের প্রভাব রাজ্য রাজনীতিতে নগণ্য। টেক-অফ করার পর বিজেপির উড়ান সঠিক পথে চলছে নাকি টালমাটাল অবস্থায় কোনোমতে পাঁচটি বছর, তারপর ফুস!
নির্বাচনের আগে কোটি কোটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি সরকার। আর বাংলার সহজ সরল মানুষ একদিনের ছুটিতে মাংস ভাত খেয়ে চুটিয়ে গেরুয়া জামায় টিক মেরে, ঘন নীল রং আঙুলে লাগিয়ে আহা কি কেতাথ না হলাম বলে ভাত ঘুম। ব্যাস! স্বপ্ন সত্যি। চারিদিকে রাম-রাম! জয় মানে আরিব্বাস কোথায় ফুল আর কোথায় ঘাস! জয় হল, শপথ হল, এবার মন্ত্রীসভা গঠন। বিজেপির ক্যাবিনেট কিন্তু বেশ চিত্তাকর্ষক। শুভেন্দু অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পাল, দিলীপ ঘোষ ক্যাবিনেটের মূল স্তম্ভ। এছাড়া বর্ষীয়ান স্বপন দাশগুপ্ত, তাপস রায়, দুধকুমার মণ্ডল প্রমুখ। আদি এবং নব্য মিলে শুভেন্দুবাবুর ক্যাবিনেট জমজমাট।
জিরো টলারেন্স টু দুর্নীতি এই হল এই ক্যাবিনেটের মূল নীতি। যা বাংলার মানুষের কাছে মানতে পারলে, সত্যি বড়ো পাওনা। এছাড়া পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে দলীয় গণতন্ত্রের পরিকাঠামো, বাংলার মানুষের জন্য ভালো বলা যায়। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এমন কিছু দলীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা বঙ্গবাসীকে চমকে দিয়েছে। বিশেষ করে কদিন আগে ঘটে যাওয়া উত্তরপ্রদেশ মডেলে "এনকাউন্টার" বেশ ভাবিয়েছে। ঠিক না ভুল সেই তর্কের লেখা পরে লেখা যাবে। বেশ কয়েকটি কাজ ভালো এগোচ্ছে। তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চিংড়িঘাটা মেট্রো রেল-এর অসমাপ্ত কাজ। আগের সরকার কিছুতেই এই কাজটি করে উঠতে পারেননি। বিজেপি সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে সফল হয়েছেন কাজটি করার বিষয়ে। তবে আগের সরকার কাজটি না করার একটা আঁশটে গন্ধ সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন। সেটা হল বেলেঘাটা রুটের অটো স্ট্যান্ডের তোলাবাজির রাজনীতি।
স্বপন দাশগুপ্তের নেতৃত্বে আদিগঙ্গা এবং সমগ্র কালীঘাট সংলগ্ন এলাকার সংস্কারের উদ্যোগও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের মানচিত্রে কালীঘাট মন্দির গুরুত্বপূর্ণ স্থান, তীর্থস্থলও বটে। আদিগঙ্গা যা একসময় পুণ্যতোয়া ছিল, বর্তমানে ড্রেজিং-এর অভাবে নালায় পরিণত হয়েছে। সেটি খুব শীঘ্র পূর্বের অবস্থায় ফেরানোর উদ্যোগ হয়তো নেওয়া হবে। শহরকে জঞ্জালমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। সেই লক্ষ্য কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসা মাত্র খিদিরপুর অঞ্চল সংলগ্ন তারাতলায় বহুতল বাড়ির কাঠামো চাপা পড়ে কুড়িজন শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় যেভাবে তৎপরতার সঙ্গে কাজ করেছে বর্তমান সরকার, তাতে সাধুবাদ না দিলে একটু অমানবিক হবে। তবে কথায় আছে, সব ভাল তার শেষ ভাল যার। এতো সবে শুরু। শুরুতেই যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিমায় কোথাও কিছু নেই-স্টেশন, ফুটপাতে হকার তুলতে শুরু করে দেওয়া। হকাররা হয়তো যেখানে প্রথম সেখানে বসে বিক্রিবাটা করে পথচলতি মানুষের অসুবিধা করে, কিন্তু রাজ্যে চাকরি, শিল্প, সুস্থ সমাজব্যবস্থা কিচ্ছু নেই, রোজগারের পথ নেই তা করবেটা কি? ক'দিন সময় দেওয়া হয়তো যেত।
তবে সরকারি কর্মচারীদের ভাতা ইত্যাদি বৃদ্ধিতে রাজ্যের বহু মানুষ খুশি। কিন্তু পূর্বের সরকার বিপুল পরিমাণে দেনা আর পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি করে বঙ্গবাসীকে পাঁকে চুবিয়ে দিয়ে গেছে, সেই পাঁক থেকে রাজ্যকে উদ্ধার করতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। শিল্পে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জুট মিল খুলতে চলেছে শীঘ্র। সবমিলিয়ে তোলাবাজি যদি আগামীদিনে না হয়, তাহলে আগামীদিনে বাংলার মানুষ নতুন সূর্যের স্বপ্ন দেখলে দেখতে পারে।