রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় বদলের ইঙ্গিত। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার একদিনের বিশেষ অধিবেশনে ধ্বনিভোটে পাশ হয়ে গেল ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ় অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। বিলটি পেশ করেন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। গত সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা বিলটিতে সম্মতি দিয়েছিল।
এই সংশোধনীর মূল কথা একটিই — মূল আইনে যুক্ত হচ্ছে নতুন ১৪এ ধারা। ওই ধারা বলছে, ‘প্রশাসনিক স্বার্থ বা প্রয়োজন’-এর ভিত্তিতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে আচার্য রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলি করতে পারবেন। এতদিন রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক বদলির কোনও ব্যবস্থাই ছিল না।
বদলি হলে চাকরির শর্ত কী দাঁড়াবে
বিল অনুযায়ী, বদলি হওয়া কর্মী চাইলে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের লিয়েন ধরে রাখতে পারবেন, আবার চাইলে স্থায়ীভাবে নতুন প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারবেন। জ্যেষ্ঠতা গোনা হবে প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকেই। সঙ্গে থাকছে চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, বদলি ভাতা এবং স্থানান্তরের খরচ ফেরতের সংস্থান।
একই অধিবেশনে পাশ হয়েছে ইউনিভার্সিটি ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬-ও। ওই বিলে রাজ্যের ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভিডেন্ট ফান্ড ব্যবস্থাপনাকে ১৯৮৩ সালের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইনের অধীনে এনে এক ছাতার তলায় আনা হচ্ছে। দু’টি বিলই গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে; কার্যকর হওয়ার তারিখ পরে আলাদা করে জানানো হবে বলে সরকারি সূত্রে খবর।
সরকারের যুক্তি
সরকারের বক্তব্য, নতুন ও তুলনায় দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি প্রকট। কলকাতার পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলিতে যে অভিজ্ঞতা জমে আছে, বদলির মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়াই ‘এক রাজ্য, এক শিক্ষা’ নীতির লক্ষ্য। উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় সভায় দাবি করেন, দেশের বহু রাজ্যেই এই ধরনের বদলি নীতি চালু রয়েছে এবং এতে শিক্ষক-ঘাটতির সমস্যা মেটানো সম্ভব।
‘‘ওঁদের অভিজ্ঞতা শিক্ষাপরিকাঠামো মজবুত করতে এবং পঠনপাঠনের মান বাড়াতে অত্যন্ত জরুরি।’’
— মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
বিল নিয়ে বিতর্কের সময় মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, পরিষেবা বিধি মেনে চলতে যাঁদের সমস্যা হবে, তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন। সরকারপক্ষের যুক্তি, রাজনৈতিক আনুকূল্যে কিছু অধ্যাপকের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙতেই এই পদক্ষেপ।
বিরোধী ও শিক্ষক সংগঠনের আপত্তি
বিরোধী শিবির বিলটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে চিহ্নিত করেছে। আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির আশঙ্কা, বদলি রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিবিশেষকে ‘বেছে নিয়ে নিশানা’ করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বদলির আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সম্মতি নেওয়া হবে কি না। তাঁর বক্তব্য, বাধ্যতামূলক বদলিতে চলতি গবেষণা প্রকল্প ও পিএইচডি ছাত্রছাত্রীদের কাজ বিপর্যস্ত হতে পারে — গবেষণাগার সামলানো অধ্যাপক চাইলেই রাতারাতি জায়গা বদল করতে পারেন না।
সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বিলটিকে ‘অশনি সংকেত’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর প্রশ্ন, পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধীনে তৈরি চাকরির শর্ত কি সাধারণ আইন করে বদলে দেওয়া যায়? তৃণমূল বিধায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও আলাদা ছুটির বিধি রয়েছে।’’ তৃণমূল বিধায়ক আলিফা আহমেদ বাধ্যতামূলক বদলির বিকল্প হিসেবে ভিজ়িটিং ফ্যাকাল্টি ও যৌথ গবেষণা কর্মসূচির প্রস্তাব দেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সংগঠন (জুটা) আগেই জানিয়েছিল, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নিয়োগবিধি রয়েছে এবং বদলির ব্যবস্থা অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা ও স্বশাসনের পরিপন্থী। আবুটা এবং ডিএসও-র মতো সংগঠনগুলি বিলটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে।
এক নজরে
বিল: দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ় অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬
পাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিধানসভার একদিনের বিশেষ অধিবেশনে, ধ্বনিভোটে
নতুন ধারা: ১৪এ — ‘প্রশাসনিক স্বার্থ বা প্রয়োজন’-এ আচার্য বদলি করতে পারবেন
সুরক্ষা: লিয়েন, প্রথম নিয়োগ থেকে জ্যেষ্ঠতা, বদলি ভাতা ও স্থানান্তর খরচ
দ্বিতীয় বিল: ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএফ ব্যবস্থাপনা একই আইনের অধীনে
বিরোধিতায়: জুটা, আবুটা, ডিএসও; আইএসএফ, সিপিএম ও তৃণমূল বিধায়করা
নজর এখন যাদবপুরে
বিতর্কের কেন্দ্রে ঘুরেফিরে এসেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। মুখ্যমন্ত্রী সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার যাদবপুরের শিক্ষকদের নাম করে সমালোচনা করেছেন, ‘বিপুল জ্ঞান’ নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছেন সেই জ্ঞান অন্যত্র কাজে লাগানো যেতে পারে। শিক্ষামহলের একাংশের ধারণা, যাদবপুরের নির্বাচিত শিক্ষক ও কর্মীদের অন্যত্র সরানোর একটি প্রশাসনিক পথ এই আইনে তৈরি হল। সরকার অবশ্য সেই ব্যাখ্যা মানেনি।
আইন কার্যকর হওয়ার বিজ্ঞপ্তি কবে বেরোয়, প্রথম বদলির তালিকায় কারা থাকেন — আগামী দিনে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মহলের নজর থাকবে সেদিকেই। শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই আইনি পরামর্শ নেওয়ার কথা ভাবছে বলে খবর।
দ্রষ্টব্য: বিধানসভার বিতর্কে দেওয়া বক্তব্যগুলি প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলায় উপস্থাপিত। বিলের আইনি পাঠ ও প্রয়োগবিধি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতেই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
ট্যাগ: #বিশ্ববিদ্যালয়বদলিবিল #পশ্চিমবঙ্গবিধানসভা #উচ্চশিক্ষা #যাদবপুরবিশ্ববিদ্যালয় #জুটা #একরাজ্যএকশিক্ষা #অধ্যাপকবদলি #প্রথমসন্দেশ