শ্রাবণের মেঘলা আকাশ, টিপটিপ বৃষ্টি আর দোলনার দুলুনি — বাংলার বৈষ্ণব উৎসবের ক্যালেন্ডারে ঝুলন যাত্রার আলাদা জায়গা। এ বছর ঝুলন উৎসব শুরু হয়েছে ২৩ অগস্ট, রবিবার, এবং শেষ হচ্ছে ২৮ অগস্ট, শুক্রবার — বলরাম পূর্ণিমার দিনে। শ্রাবণ মাসের শুক্লা একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত এই পাঁচ দিন ধরেই দোলনায় দোল খান রাধা ও কৃষ্ণ।
কী এই ঝুলন যাত্রা
ঝুলন যাত্রা মূলত বর্ষাকালীন প্রেমের উৎসব। বৈষ্ণব শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বৃন্দাবনে বর্ষার দিনে গাছের ডালে দোলনা বেঁধে রাধা, কৃষ্ণ, সখী ও সখারা দোল খেতেন। সেই লীলার স্মরণেই মন্দিরে মন্দিরে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহকে ফুলে সাজানো দোলনায় বসিয়ে ঝোলানো হয়। রীতি অনুযায়ী দোলনা দোলানো হয় পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে।
পাঁচ দিন ধরে চলে নামগান, কীর্তন, বিশেষ আরতি ও ভোগ নিবেদন। বহু মন্দিরে ভক্তেরা নিজে হাতে দোলনা দোলানোর সুযোগ পান — এটিকেই সেবার একটি রূপ বলে মনে করা হয়। প্রতিদিন বিগ্রহের সাজপোশাক বদলায়, বদলায় দোলনার ফুলের সজ্জাও।
এক নজরে ঝুলন যাত্রা ২০২৬
- শুরু: ২৩ অগস্ট, ২০২৬ (শ্রাবণ শুক্লা একাদশী)
- শেষ: ২৮ অগস্ট, ২০২৬ (শ্রাবণ পূর্ণিমা)
- স্থিতিকাল: পাঁচ দিন
- শেষ দিনের বিশেষত্ব: বলরাম পূর্ণিমা তথা বলরাম জয়ন্তী, একই দিনে রাখি পূর্ণিমাও
- মূল কেন্দ্র: নবদ্বীপ, মায়াপুর, শান্তিপুর, মাহেশ (শ্রীরামপুর), মহিষাদল
বাংলার ঝুলন: নবদ্বীপ থেকে মাহেশ
পশ্চিমবঙ্গে ঝুলনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নদিয়া জেলা। নবদ্বীপ, মায়াপুর ও শান্তিপুরে ঝুলন পূর্ণিমা পালিত হয় মহা ধুমধামে। মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে রাধামাধবকে ফুল ও অলঙ্কারে সাজিয়ে দোলনায় বসানো হয়; মন্দির চত্বর সাজে ফুল ও আলোর মালায়, শেষ দিনে থাকে শোভাযাত্রা ও নাট্যানুষ্ঠান।
হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশেও ঝুলন উৎসবের চল রয়েছে — যে মাহেশ রথযাত্রার জন্য গোটা রাজ্যে পরিচিত। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল রাজবাড়ির মন্দিরে প্রায় দুশো বছর ধরে ঝুলন পালিত হয়ে আসছে বলে জানা যায়। কলকাতার বউবাজার অঞ্চলেও পুরনো ঝুলনবাড়ির ঐতিহ্য রয়েছে।
সব জায়গায় অবশ্য পাঁচ দিনের রীতি নয়। কোথাও কোথাও ত্রয়োদশী থেকে পূর্ণিমা — এই তিন দিন ঝুলন পালিত হয়, আবার বহু মন্দিরে কেবল পূর্ণিমার দিনটিতেই উৎসব সীমাবদ্ধ থাকে।
ঘরে ঘরে ‘ঝুলন সাজানো’
মন্দিরের বাইরেও ঝুলনের একটা নিজস্ব বাঙালি চেহারা আছে। বহু বাড়িতে, বিশেষত ছোটদের উদ্যোগে, ছোট ছোট মাটির পুতুল, গাছপালা, পাহাড়-নদীর মডেল দিয়ে সাজানো হয় ‘ঝুলন’। মাঝখানে থাকে ছোট্ট দোলনা, তাতে রাধাকৃষ্ণ। পাড়ায় পাড়ায় সেই ঝুলন দেখতে যাওয়ার রেওয়াজ এক সময় ছিল বাংলার বর্ষার অন্যতম আনন্দ। শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির যুগে সেই চল কিছুটা কমলেও মফস্সল ও গ্রামবাংলায় আজও তা টিকে আছে।
শেষ দিনে তিন উৎসবের মিলন
ঝুলনের শেষ দিনটি, অর্থাৎ ২৮ অগস্ট, একই সঙ্গে তিনটি তাৎপর্য বহন করছে। এটি ঝুলন পূর্ণিমা, এটিই বলরাম পূর্ণিমা — বলরামের আবির্ভাব তিথি, আবার এই দিনেই রাখি পূর্ণিমা। বৈষ্ণব মন্দিরগুলিতে বলরাম জয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ পুজো, আবির খেলা ও ভোগ নিবেদনের রীতি রয়েছে। ফলে ঝুলনের সমাপ্তি দিনটি কার্যত উৎসবের সবচেয়ে জমজমাট দিন হয়ে ওঠে।
দ্রষ্টব্য: তিথি ও উৎসবের দিনক্ষণ পঞ্জিকাভেদে সামান্য বদলাতে পারে। মন্দিরভেদে অনুষ্ঠানসূচিও আলাদা হয়। নির্দিষ্ট মন্দিরের কর্মসূচি জানতে সেখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
#ঝুলনযাত্রা#ঝুলনপূর্ণিমা#বলরামপূর্ণিমা#রাখিপূর্ণিমা#নবদ্বীপ#মায়াপুর#শান্তিপুর#মাহেশ#বৈষ্ণবউৎসব